প্রধান সংবাদ

বৃদ্ধাশ্রম: বদলে যাওয়া সমাজ ও মানবিকতার প্রশ্ন

সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলে গেছে পারিবারিক সম্পর্কের ধরনও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ আজ প্রযুক্তিতে উন্নত, জীবনযাত্রায় গতিশীল; কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ। এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রতিফলন দেখা যায় বৃদ্ধাশ্রমের বাস্তবতায়।

আমাদের সমাজে “বৃদ্ধাশ্রম” শব্দটি এখনও এক ধরনের নেতিবাচক অনুভূতির জন্ম দেয়। কারণ অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, বৃদ্ধাশ্রম মানেই বাবা-মাকে পরিত্যাগ করার জায়গা। বাস্তবতাও অনেক ক্ষেত্রে তাই। সন্তানদের অবহেলা, ব্যস্ততা কিংবা স্বার্থপরতার কারণে বহু প্রবীণ মানুষ জীবনের শেষ সময় কাটান বৃদ্ধাশ্রমে অথবা নিজ ঘরেই নিঃসঙ্গ অবস্থায়।

তবে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বৃদ্ধ নিবাসকে প্রবীণদের জন্য নিরাপদ ও সেবামূলক আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করাই সেখানে মূল উদ্দেশ্য। অনেক প্রবীণ নিজের ইচ্ছাতেই সেখানে বসবাস করেন, যাতে তারা সমবয়সীদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সেবা পান।

কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে অধিকাংশ প্রবীণের জন্য বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠে বাধ্যতামূলক আশ্রয়স্থল। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের অনেক মা-বাবাও আজ বৃদ্ধাশ্রমে জীবন কাটাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়—চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম।

একজন মা-বাবা তাদের সন্তানের জন্য জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় উৎসর্গ করেন। নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেন, ভবিষ্যৎ গড়ে দেন। অথচ সেই সন্তানই একসময় তাদের “বোঝা” মনে করতে শুরু করে। এই বাস্তবতা শুধু পারিবারিক নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সব অবহেলিত প্রবীণই বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন না। অনেকেই নিজ বাড়িতে থেকেও মানসিকভাবে একা। পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ততা, প্রজন্মগত দূরত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারার কারণে তারা ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। প্রয়োজনের সময় কথা বলার মানুষটিও পাশে থাকছে না।

প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব শুধু পারিবারিক নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। কারণ আজ যারা বৃদ্ধ, তারাও একদিন ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ এবং ভালোবাসার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থা।

তাই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। বৃদ্ধাশ্রমকে ঘৃণার প্রতীক না বানিয়ে, প্রবীণদের মর্যাদা ও সেবার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি পরিবারে মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। সন্তানদের বুঝতে হবে—বাবা-মা কোনো বোঝা নন; তারা আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। মানবিক সমাজ গঠনের প্রথম শর্ত হলো প্রবীণদের সম্মান করা। কারণ যে সমাজ তার বয়োজ্যেষ্ঠদের মূল্য দিতে জানে না, সে সমাজ কখনও সত্যিকার অর্থে সভ্য হতে পারে না।

এ বিভাগের আরও সংবাদ