সারা দেশ যখন পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ আর কোরবানির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঠিক তখন নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার একদল মানুষ নিজেদের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে। পরিবার-পরিজন ভুলে পুরো দ্বীপবাসীর ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সচল রাখাই ছিল যাদের একমাত্র লক্ষ্য। তারা হলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হাতিয়া কার্যালয়ের মাঠপর্যায়ের লাইনকর্মী ও প্রকৌশলীরা।
এবারের ঈদে হাতিয়াবাসীর আলো নিশ্চিত করতে পিডিবি কর্মীদের দিতে হয়েছে চরম অগ্নিপরীক্ষা। ঈদুল আজহার ঠিক দুই দিন আগে থেকে হাতিয়ায় শুরু হয় তীব্র কালবৈশাখী ঝড় ও আকস্মিক বৃষ্টি। ঝড়ের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে দ্বীপের বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। উপড়ে পড়ে গাছপালা, ছিঁড়ে যায় তার। যখন সাধারণ মানুষ ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখন জীবনঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামেন পিডিবির লাইনকর্মীরা।বজ্রপাত, তীব্র বাতাস ও হাই-ভোল্টেজ লাইনের চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে, ভেজা শরীরে দিন-রাত এক করে লাইনে ঝুলে কাজ করেছেন তারা। এই দুর্যোগে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এবং দ্রুত সংযোগ সচল করতে ঈদের আনন্দ কোরবানি দিয়ে মাঠে থেকে সার্বিক নেতৃত্ব দিয়েছেন পিডিবির স্থানীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, তদারকি এবং কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করার কারণেই দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ সচল করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার নিষ্ঠুর পরিহাস হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুরক্ষার স্বার্থে কিংবা লাইনে বড় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে মানুষ ধৈর্যের পরিচয় না দিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন এই কর্মীদের ওপর। অনেক সময় কন্ট্রোল রুমের ফোনে ধেয়ে আসে অশোভন গালিগালাজ। অথচ সাধারণ গ্রাহকেরা অনেকেই বোঝেন না যে, দ্বীপ অঞ্চলের প্রতিকূল আবহাওয়ায় একটি ছিঁড়ে যাওয়া তার জোড়া লাগাতে কতটা অমানবিক কষ্ট এবং প্রাণের ঝুঁকি নিতে হয়।
পিডিবির এক লাইনকর্মী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “ঈদের দুই দিন আগে থেকে ঘুম-খাওয়া ছেড়ে আমরা লাইনে আছি। পরিবারকে সময় দেওয়া তো দূরের কথা, ঠিকমতো ঈদের নামাজটাও পড়তে পারিনি। আমরা কষ্ট করি মানুষের আনন্দের জন্য। কিন্তু কাজ শেষে যখন মানুষ ধন্যবাদ দেওয়ার বদলে গালি দেয়, তখন সব উৎসাহ হারিয়ে যায়।”
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। দুর্যোগের মাঝেও বুক চিতিয়ে লড়াই করা হাতিয়া পিডিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের প্রতিটি কর্মীর এই নীরব ত্যাগ ও সেবাকে সম্মান জানানো আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। বিদ্যুৎ চলে গেলে ক্ষিপ্ত না হয়ে, এই ‘আলোর ফেরিওয়ালাদের’ প্রতি আমাদের আরও সহনশীল ও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত।









