অনন্তের পথে মুকুল ভাই: ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ারুল ইসলাম রাশেদ
- প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬। ১১:৩২:৫৭ পিএম
অত্যন্ত বেদনাভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানতে পারলাম, হাতিয়া দ্বীপের কৃতি সন্তান, ময়মনসিংহ মহাবিদ্যালয় (আখতারুজ্জামান কলেজ)-এর সম্মানিত অধ্যক্ষ, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, প্রগতিশীল সমাজচিন্তার অগ্রসেনানী এবং আমাদের সকলের প্রিয়জন অধ্যক্ষ শফিকুল হায়দার মুকুল আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন; যার শোক শুধু তাঁর পরিবার বা স্বজনদের নয়, সমগ্র শিক্ষা-সমাজ, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষক-শুভানুধ্যায়ীর হৃদয়কে গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন করেছে। এই ক্ষতি নিঃসন্দেহে অপূরণীয়।
আনন্দমোহন কলেজের একজন কৃতী, মেধাবী ও স্বপ্নবান শিক্ষার্থী হিসেবে যে আলোকিত যাত্রার সূচনা তিনি করেছিলেন, তা ক্রমে বিস্তৃত হয়ে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সততা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল। তিনি ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন; ছিলেন একজন আলোকবর্তিকা, একজন মননশীল চিন্তক, একজন মানবপ্রেমিক সমাজসেবক এবং ন্যায়, সত্য ও মানবিক মূল্যবোধের একনিষ্ঠ সাধক।
শিক্ষাদান ছিল তাঁর পেশা, কিন্তু মানুষ গড়ার মহৎ ব্রত ছিল তাঁর জীবনের মূল সাধনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল তথ্য বা ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং আলোকিত, সচেতন ও মানবিক মানুষ গড়ে তোলা। শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন সততা, নৈতিকতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মানবপ্রেম এবং দেশপ্রেমের মর্মবাণী। তাঁর প্রতিটি উচ্চারণে ছিল জাগরণের আহ্বান, প্রতিটি কর্মে ছিল একটি উন্নত সমাজ নির্মাণের অদম্য প্রত্যয়।
সুদূর নোয়াখালীর হাতিয়ার মাটি থেকে উঠে এসে তিনি ময়মনসিংহের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে যে সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসার আসন নির্মাণ করেছিলেন, তা তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, কর্মনিষ্ঠা ও মানবিকতারই স্বীকৃতি। মানুষের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিল নির্মল নদীর মতো স্বচ্ছ, সম্পর্কের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল পর্বতের মতো অটল, আর সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল অনুকরণীয়। শিক্ষার প্রতি নিবেদন যেন তিনি উত্তরাধিকারসূত্রেই লাভ করেছিলেন; তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতাও হাতিয়ার স্বনামধন্য তমরদ্দি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পিতার সেই আলোকিত আদর্শকে তিনি আজীবন বুকে ধারণ করে এগিয়ে গেছেন জ্ঞানের অভিযাত্রায়।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তাঁর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আজ সেই কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ের গভীরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। প্রাণোচ্ছল, উদার, স্বপ্নময় এবং সমাজমনস্ক সেই মানুষটির কণ্ঠে তখনও উচ্চারিত হচ্ছিল শিক্ষা, মানবতা, গণতন্ত্র ও দেশ নিয়ে গভীর আশাবাদের বাণী। তাঁর চোখে ছিল একটি সুন্দর, প্রগতিশীল ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন। কে জানত, সেটিই হবে শেষ আলাপন! কে জানত, স্মৃতির ভাণ্ডারে সযত্নে রক্ষিত সেই কথাগুলোই হয়ে থাকবে তাঁর সঙ্গে শেষ দীর্ঘ সংলাপ!
ছাত্রজীবনে একজন আদর্শনিষ্ঠ, মেধাবী ও সাহসী ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি যেমন প্রগতিশীল চিন্তার অগ্রদূত ছিলেন, তেমনি শিক্ষকতা জীবনে হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর প্রেরণার বাতিঘর। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা হলো মানুষের মুক্তির পথ, অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
তাঁর সান্নিধ্যে আসা প্রতিটি মানুষ তাঁর সৌজন্য, প্রজ্ঞা ও হৃদয়ের উষ্ণতায় মুগ্ধ হয়েছে। তাঁর ছাত্ররা তাঁকে স্মরণ করবে একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে। সহকর্মীরা তাঁকে স্মরণ করবেন সততা, নিষ্ঠা ও কর্মপ্রাণতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে। আর শুভানুধ্যায়ীরা স্মরণ করবেন এমন এক নির্মল হৃদয়ের মানুষকে, যিনি নিজের জন্য নয়, মানুষের কল্যাণের জন্যই বেঁচে ছিলেন।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, আদর্শ, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার মধ্য দিয়ে মৃত্যুকেও অতিক্রম করেন। তাঁরা শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁদের রেখে যাওয়া আলো কখনো নিভে যায় না। অধ্যক্ষ শফিকুল হায়দার মুকুল ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রস্থান আমাদের হৃদয়ে গভীর শূন্যতার জন্ম দিয়েছে, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর জ্ঞানচর্চা এবং তাঁর মানবিক মূল্যবোধ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
আজ তিনি পৃথিবীর সকল কোলাহল, কর্মব্যস্ততা, সুখ-দুঃখ এবং মায়ামমতার বন্ধন ছিন্ন করে অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন। রেখে গেছেন অসংখ্য স্মৃতি, অগণিত মানুষের ভালোবাসা, অফুরন্ত প্রেরণা এবং এক আলোকোজ্জ্বল জীবনাদর্শের মহিমান্বিত উত্তরাধিকার। তাঁর জীবন ছিল প্রদীপের মতো—নিজে জ্বলে অন্যকে আলোকিত করার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। সেই আলো আজও আমাদের পথ দেখাবে, আগামীকালও দেখাবে।
মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে মরহুম অধ্যক্ষ শফিকুল হায়দার মুকুলের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন। সেই সঙ্গে তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, ছাত্র-ছাত্রী এবং অগণিত গুণগ্রাহীকে এই গভীর শোক বহন করার ধৈর্য ও মানসিক শক্তি দান করুন।
শ্রদ্ধাঞ্জলির শেষ প্রান্তে…
প্রিয় মুকুল ভাই,
আপনি আজ আমাদের দৃষ্টির আড়ালে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের বাইরে নন।
আপনার পদচিহ্ন মুছে যাবে না, আপনার শিক্ষা ফুরিয়ে যাবে না, আপনার মানবিকতার আলো নিভে যাবে না।
আপনি নেই—তবু আপনি আছেন;
আপনার আদর্শে, আপনার কর্মে, আপনার ছাত্রদের সাফল্যে, আপনার স্বপ্নে এবং আপনাকে ভালোবাসা মানুষের স্মৃতিতে।
অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা, অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা ও গভীর ভালোবাসায়—বিদায়, প্রিয় মুকুল ভাই।
প্রধান সংবাদ | ১৬ জুন ২০২৬
অনন্তের পথে মুকুল ভাই: ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ারুল ইসলাম রাশেদ


















