অপার সম্ভাবনার হাতছানি নিঝুমদ্বীপ দুই দশক ধরে উপেক্ষিত
- প্রকাশিত : বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬। ২:৩৪:৩২ এএম
প্রকৃতির যেখানে অপরূপ সমাহার সাথে জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ এক অবারিত অঞ্চল সেটাই তো হবে পর্যটনের জন্য আদর্শ ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পর্যটন সম্ভাবনার সকল উপাদান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ দুই দশকেও অবহেলিত প্রাকৃতিক লীলাভূমি খ্যাত জাতীয় উদ্যান নিঝুমদ্বীপ। পর্যটন কর্পোরেশনের সদিচ্ছা ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গীর অভাবে আজো উন্মোচিত হতে পারেনি পর্যটন সম্ভাবনাময় এই নিঝুমদ্বীপ।
অবস্থান ও নামকরণ: বঙ্গোপসাগর মোহনায় হাতিয়াদ্বীপের ১২শত মিটার দক্ষিণে অবস্থিত নিঝুমদ্বীপ। জানা যায়, ১৯৪০ দশকে জেগে উঠা দ্বীপটির প্রথম নাম ছিল বাল্ল্যার চর। এর তটভূমিতে ভেল্লা জাতীয় একজাতীয় উদ্ভিদ ঘরছাউনীতে ব্যবহারে সংগ্রহ করতো আসতো স্থানীয়রা। ষাটের দশকে মৎস্যজীবীদের অনুকূল পরিবেশে দ্রুত মানববসতি গড়ে উঠে। ১৯৭০ এর সাইক্লোনে অনেক প্রাণহানীর মাঝেও একনারী কেওড়া বাগানে আটকে জীবন পায়। পরে তার নাম হয় কেরপা বুড়ী। বনবিভাগের ম্যানগ্রোভ সবুজ-বেষ্টনী দ্বীপটিকে দ্বিতীয় সুন্দরবনের রূপ এনে দেয়। ১৯৭৫ সালে স্থানীয় এমপি আমিরুল ইসলাম কালাম এর নামকরণ করেন নিঝুমদ্বীপ। এ সময় বনবিভাগের অবমুক্ত কয়েকজোড়া হরিণ নিঝুমদ্বীপে চিত্রাহরিণের এক নব দিগন্তের সূচনা করে।
জাতীয় উদ্যান ঘোষণাঃ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রের অপূর্ব রূপায়ণের সম্ভার নিঝুমদ্বীপকে ২০০১ সালে পর ২৫ হাজার একর বনভূমিকে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে জাহাজমারা সদর বিট, চরকালাম বিট ও চররৌশন বিটের ৪০ হাজার ৩৯০ একর জাতীয়উদ্যান ও সংরক্ষিত বনভূমির সরকারি গ্যাজেট হয়।
কি নেই নিঝুমদ্বীপে? একই অঙ্গে দুই রূপ এই হচ্ছে নিঝুমদ্বীপ। কক্সবাজার ও সুন্দরবনকে এক সাথে দেখার অন্যতম স্থান এই নিঝুমদ্বীপ। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রীণবেল্ট যেন এক সবুজের মেলা। বিভিন্ন প্রজাতির জীববৈচিত্র্যে অন্যতম অনুসঙ্গ চিত্রাহরিণের দিকবিদিক দুরন্ত ছুটে চলার মায়াবী দৃশ্য সবুজের লীলাভূমিকে এক ভিন্নমাত্রার উপযোগীতা সৃষ্টি করেছে। পাশেই বিস্তৃত সমুদ্র সৈকতের মনোরম দৃশ্য। জোয়ারের পূর্ণতায় ভেসে আসা সাগরের গর্জণ, ছুটে আসা ছোটবড় মৃদু ঢেউ বালুকাময় তটে আছড়ে পড়ার অপরূপ সৈন্দর্য্য সূর্যাস্তের বেলাভূমি যেন প্রকৃতির রং তুলির এক অপূর্ব শৈল্পিক রূপ দ্বীপ জুড়ে ফুটে উঠে। সেই স্বপ্নিল দৃশ্য অবলোকনে পর্যটকদের বারবার কাছে টানে। বনের মধ্যে প্রকৃতিগত আঁকাবাকা ছড়িখালে পর্যটকদের নৌবিহার আয়োজন। নদীতে মাছ ধরা নৌকাগুলি যেন চিত্রপটে জলতরঙ্গের প্রতিচ্ছবি। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে প্রকৃতির সকল রূপ রস ও বৈচিত্র্য একসাথে স্বর্গীয় পরিবেশ ধরা দিয়েছে এই নিঝুমদ্বীপে।
পাখির রাজ্য নিঝুমদ্বীপ: দ্বীপটির বিশাল জলরাশিতে নানা প্রজাতির দেশ বিদেশী অতিথি পাখ পাখালীর মুখরিত পরিবেশ। শীতে উষ্ণতার খোঁজে অতিথি পাখিদের যেন এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় নিঝুমদ্বীপ। এ সময় দেখা মেলে সাইবেরিয়ান পরিযায়ী রাজহাঁস, নিলশির, সরালি, বাটান, পানকৌড়ি, ছখ্খা খোয়াজ, গাংচিল, মাছরাঙ্গা, সাদা বলাকা ঝাঁক সহ নাম না জানা কত পাখি। পাখিদের অভয়ারণ্য এখানে সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক গবেষণার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন সময়ে পরিযায়ী উৎসব অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়।
নোয়াখালী জেলার ব্রান্ডিং নিঝুমদ্বীপ: ইতিমধ্যে জেলা নোয়াখালীকে ‘নিঝুম দ্বীপের দেশ’ নামে ব্রান্ডিং করার কাজ চলছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে নিঝুমদ্বীপে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেও কার্যত এখনো বাস্তব কিছু প্রতিফলিত হয়নি। নিঝুমদ্বীপের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসন আশারবানী শুনিয়ে যাচ্ছেন। তবে এসব উন্নয়ন কর্মকান্ড আশায় গুড়েবালি বলে হতাশ পর্যটন পিপাসু মহলের।
যেভাবে পর্যটন বিকাশ হতে পারে: নিঝুমদ্বীপের মানুষের জীবনযাত্রার সাথে বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণের সকল উপাদান উপযোগী করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ শুটকি শিল্প, খেজুররস, প্রাকৃতিক মধু সংগ্রহ, মৎস্য আহরণ ও পাখীদের অভয়ারণ্যে ও চিত্রাহরিণের দৃশ্য অবলোকনে পর্যটন স্পটগুলোতে প্রাপ্ত সুযোগ অনুসন্ধান করে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে উদ্যেক্তা সৃষ্টি করতে পর্যটন কর্পোরেশনের ভূমিকা অপরিহার্য।
নিঝুমদ্বীপের প্রথম জনপ্রতিনিধি তাজুল ইসলাম জানান, সুদূর প্রসারী ও পরিকল্পিত উদ্যোগে নিঝুমদ্বীপ জাতীয় উদ্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা পর্যটনকেন্দ্র এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল সোপানও হতে পারতো। সরকারের সচিব পর্যায়ের এমনকি পর্যটনের কর্তাব্যক্তিরা বহুবার এখানে এসে বলেছিলেন পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলবেন। অথচ দুই দশকেও বাস্তবে পর্যটন কর্পোরেশনের কোন ছোঁয়া লাগেনি। হাতেগোনা কিছু পর্যটক নিঝুমদ্বীপ ভ্রমণে আসে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ভগ্ন দশা, মানসম্মত হোটেল বা রিসোর্টের অপ্রতুলতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার অভাবে এই দ্বীপ এখনো পর্যটক আকর্ষণ করতে পারে নি।
ক্যাবল কারের যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন সম্ভবঃ ঢাকা থেকে সন্ধ্যায় লঞ্চে উঠে সকালে হাতিয়াদ্বীপে সহজে পৌঁছা গেলেও নিঝুমদ্বীপে যাতায়াত মানসম্মত নয়। এক্ষত্রে নিঝুমদ্বীপটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও এর জীববৈচিত্র রক্ষা করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর উদ্যোগ আমূল পরিবর্তন হতে পারে। হাতিয়া ও নিঝুমদ্বীপ বিভাজনকারী মোক্তারিয়া চ্যানেলের উপর ক্যাবেল কার দিয়ে পুরো নিঝুমদ্বীপ জাতীয় উদ্যানের যাবতীয় উপাদান সমূহ ঘুরে দেখার ব্যবস্থা করে দেওয়া। এই একটি ক্যাবল কারের সংযোগ স্থাপন পুরো দ্বীপে পর্যটনের সকল দ্বার উন্মোচিত হবে বলে পর্যটনের সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
হাতিয়া জাহাজমারা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষণ কর্মকর্তা একেএম আরিফুজ্জামান বলেন, অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও নিঝুমদ্বীপে পর্যটকদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা কিংবা পর্যটনের বিকাশ হয়নি। তদুপরি জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর সরকার এটাকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করে। পাশাপাশি সরকার সমন্বয়হীনতার মধ্যে নিঝুমদ্বীপের বনভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ফলে জীববৈচিত্রের মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রধান সংবাদ | ৩ মার্চ ২০২৬
অপার সম্ভাবনার হাতছানি নিঝুমদ্বীপ দুই দশক ধরে উপেক্ষিত


















