শৈশবের বর্ণপরিচয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত দীর্ঘ পথচলায় বহু শিক্ষকের সান্নিধ্য ও স্নেহ পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য। তবু জীবনের এই পরিণত লগ্নে দাঁড়িয়ে যাঁর কথা বারবার অন্তরে তোলপাড় তোলে, তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন; তিনি আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার পাঠানো এক অমূল্য আশীর্বাদ—শিক্ষক রূপের আড়ালে আমার দ্বিতীয় পিতা।
আমার জন্ম নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন উপকূলীয় জনপদ হাতিয়ায়। জন্ম থেকেই ছিল দৃষ্টিস্বল্পতা। তবে চর্মচক্ষু দিয়ে পুরো পৃথিবী দেখার সুযোগ না হলেও সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছিলেন প্রখর স্মৃতিশক্তি ও অনুসন্ধিৎসু মন। সমবয়সী আট-দশটা শিশুর চেয়ে আমি ছিলাম অনেকটাই আলাদা। যেকোনো কথা একবার শুনলেই তা স্মৃতিতে গেঁথে যেত। প্রযুক্তির প্রতি ছিল দুর্নিবার এক কৌতূহল, আর সুরের প্রতি গভীর টান—আপন মনে গান গাইতাম। কিন্তু গ্রামের যে মানুষগুলোর অপছন্দের তালিকায় আমি ছিলাম, তাদের কাছে আমার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাও যেন অপরাধ বলে গণ্য হতো। গান গাওয়া নিয়েও জুটত তীব্র কটূক্তি। মেধার স্ফুরণ দেখে দু-একজন বাহবা দিলেও অধিকাংশের কাছ থেকে মিলত নির্মম তাচ্ছিল্য আর উপহাস। শৈশব পেরোতেই চারপাশের বৈরী আচরণে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হতে থাকে বয়সের চেয়েও ভারী সব তিক্ততা।
একপর্যায়ে সেই মানসিকতা রূপ নিল চরম নিষ্ঠুরতায়। দৃষ্টিস্বল্পতার অজুহাতে আমাকে দিয়ে পড়াশোনা চালানো সম্ভব নয় বলে গ্রামের বিদ্যালয় থেকেই আমাকে বের করে দেওয়া হলো। পড়ালেখার পাট চুকিয়ে দেওয়ার পর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সেই সমাজ আমাকে যেন রাতারাতি এক ‘অভিশপ্ত মানুষ’ বানিয়ে ফেলল। কেউ কেউ আমার এই সীমাবদ্ধতার পেছনে মা-বাবার অতীত পাপের দোহাই দিত, আবার কেউ রটাত যে স্বয়ং বিধাতা আমাকে শাস্তি দিয়েছেন। চেনা মানুষগুলো যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, সেই ঘোর দুঃসময়ে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পাড়ার বড় ভাই সাইফুল মাসুম ও মাকসুদ ভাই। বয়সে বড় হলেও মাসুম ভাই আমার সাথে মিশতেন সমবয়সী বন্ধুর মতো। এই দুজনই আমাকে পরম আদরে আগলে রাখতেন, বুকে জোগাতেন নতুন করে বাঁচার অদম্য সাহস।
আমাকে নিয়ে মা-বাবার চোখেমুখে নেমে এসেছিল গভীর দুর্ভাবনা। বাবা শুধু একটাই কথা বলতেন—নিজের শেষ সম্বল ভিটেটুকু বিক্রি করে হলেও তিনি ছেলের চোখের আলো ফিরিয়ে আনবেন। শৈশবে বাবা নিজেই হাত ধরে এক চিকিৎসক থেকে অন্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সংসারের নানা টানাপোড়েনে বাবার পক্ষে আর বারবার শহরে আসা সম্ভব হয়ে উঠত না।
সেই চিকিৎসার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টি নেমে আসে ২০১৩ সালে। চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের সামনে আমি, মাসুম ভাইয়ের বড় ভাই শ্রদ্ধেয় মামুন ভাইয়া আর আমাদের শৈশবের গৃহশিক্ষক নাসির ভাইয়া বসে আছি। বাবা তখন বাড়িতে বসে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। বোর্ডের প্রধান চিকিৎসক যখন টেলিফোনে বাবার সাথে কথা বলছিলেন, আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম প্রতিটি বাক্য। চিকিৎসকের গম্ভীর কণ্ঠ জানিয়ে দিল—আমার চোখ আর কোনোদিন ভালো হবে না। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, বুকের খাঁচা থেকে নির্দয়ভাবে কেউ যেন শেষ নিঃশ্বাসটুকু ছিনিয়ে নিল। বিদায়লগ্নে চিকিৎসকেরা একটি সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের ঠিকানা সংবলিত কাগজের টুকরো ভাইয়াদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মামুন ভাইয়াই নাসির ভাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে নিজে উদ্যোগী হয়ে মুরাদপুরের সেই স্কুলের সন্ধানে বের হলেন। বহু খোঁজাখুঁজির পর একপর্যায়ে তাঁরা ঠিকানাটি বের করলেন।
অবশেষে একদিন হাজির হলাম চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সেই সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা তখন ছিল বড়ই করুণ; নড়বড়ে, জরাজীর্ণ পুরনো এক ভবনে চলত এর কার্যক্রম। সেই জরাজীর্ণ ভবনেরই একটি অচেনা কক্ষে যখন আমি ভয়ার্ত মন নিয়ে বসে আছি, ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব এসে কোনো ভূমিকা ছাড়াই আমার সাথে খুনসুটি শুরু করলেন। মুহূর্তেই মন থেকে উবে গেল সব সংকোচ আর ভয়। কিছু সময় যেতেই বুঝতে পারলাম, তিনিই এই বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক—শ্রদ্ধেয় আব্দুস সামাদ স্যার।
প্রথম সাক্ষাতেই স্নেহের অমোঘ পরশে তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীটা এক যুদ্ধক্ষেত্র, এখানে লড়াই করেই বাঁচতে হবে।” আমি সত্যি পড়তে পারব কি না জানতে চাইলে স্যার তৎক্ষণাৎ অভয় দিয়ে বললেন, “কেন নয়? নিশ্চয়ই পারবে।” তবে জানালেন, পড়ার সুযোগ পেতে হলে একটি যোগ্যতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। অন্তরে জেদ চেপে বসল—আমাকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এই পৃথিবীকে দেখিয়ে দিতে হবে যে চোখের দৃষ্টি না থাকলেও স্বপ্ন জয়ের সামর্থ্য আমার আছে। তিন দিনের মাথায় যখন স্যার এসে হাসিমুখে জানালেন আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি, সেদিন মনে হয়েছিল অন্ধকার চিরে যেন এক নতুন জীবন ফিরে পেলাম।
কথায় বলে, কেবল জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না; পিতৃত্বের প্রকাশ ঘটে আত্মিক বন্ধনে, পথপ্রদর্শনে আর সুপ্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করার নিরলস সাধনায়। সামাদ স্যারের সান্নিধ্যে আসার পর সেই সত্য আমি প্রতিপদে অনুভব করেছি। প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাসের বাইরে গিয়ে আমি কীভাবে আরো সামনে এগিয়ে যেতে পারি, কীভাবে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি—সেই ভাবনাই ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক ধ্যানের বিষয়। তিনি আমাকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যেতেন, সমাজের নানা মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে চলতে শেখাতেন। আঙুলের স্পর্শে ব্রেইলের বিন্দুর ভেতর দিয়ে যিনি আমাকে জ্ঞানের আলোর সাথে পরিচয় করালেন, তিনি আর কেউ নন—আমার আব্দুস সামাদ স্যার। আমার শ্রদ্ধেয় পিতার পর দূর শহরে তিনিই ছায়ার মতো বটবৃক্ষ হয়ে আমার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছিলেন; শিক্ষক রূপের আড়ালে হয়ে উঠেছিলেন আমার আরেক পরম মমতায় পিতা।
আজ যখন দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণে বুক ফুলিয়ে হাঁটি, তখন বারবার ফেলে আসা অতীতের দিকে দৃষ্টি ফিরে যায়। শৈশবের সেই ঘোর অমানিশায় সামাদ স্যার যদি আমার হাতটি শক্ত করে না ধরতেন, অবহেলা আর বঞ্চনার অন্ধকারে আজ আমার অবস্থান কোথায় থাকত, তা জানা নেই। একজন শিক্ষার্থী ও আত্মজ হিসেবে স্যারের সুউচ্চ প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি জানি না, তবে আজ অন্তরের গভীর থেকে এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—আমাকে ঘিরে আব্দুস সামাদ স্যারের দেখা প্রতিটি স্বপ্ন আমি নিজের সর্বস্ব দিয়ে বাস্তবে রূপ দেব।





