শিরোনাম
বিশেষ সংবাদ

শান্তর ‘এ গ্রেড’ দশটা গোল্ডেন এ-প্লাসের চেয়েও দামি

আর দশটা গোল্ডেন এপ্লাস (A+) এর চেয়েও শান্তর ফলাফলটা অনেক বেশি সাধনার এবং অসীম সাফল্যের। আলালের ঘরের দুলালদের A+ হয়তো খাতার পাতায় চকচক করে, কিন্তু দ্বীপের বুকে লড়াই করে পাওয়া আমার ছাত্র শান্তর অর্জিত ফলাফল নিছক কোনো ফলাফল নয়—এটি এক সমুদ্র দীর্ঘশ্বাস, অন্তহীন সাধনা আর বুকভাঙ্গা কষ্টের সোনালি ফসল।

​তিন বছর আগের কথা। তখন শান্তর এসএসসি পরীক্ষা চলছে। চোখের সামনে তিল তিল করে ক্যান্সার নামক মরণব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে বিদায় নিয়েছিলেন তার বাবা। পরীক্ষার মাত্র তিন-চারটি বিষয় বাকি, ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে চিরবিদায় নেন বাবা। পড়ার টেবিলে বইয়ের পাতায় চোখ রাখার বদলে নিরুদ্ধ কান্নার অশ্রুতে শান্তর বইয়ের পাতাগুলো ভিজে চুপসে যেত। বুকের গভীরে চেপে বসা সেই অসীম শোক আর পাহাড়সমান যন্ত্রণা নিয়ে কোনোমতে সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং B গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়।

​পিতার মৃত্যুর সেই শোকের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধের আরও কঠিন এক অধ্যায়। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারানোর পর নেমে আসে চরম হাহাকার। বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে জমিজিরেত দু-চার শতক যা ছিল সবই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল আগেই। ক্যান্সারের কাছে হেরে গিয়ে পুরো পরিবারটি হয়ে পড়ে একেবারেই নিঃস্ব। বড়-ছোট দুই বোন আর বিধবা মাকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে শান্ত। বড় বোনের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেলেও ছোট বোনটি বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। অভাবের তাড়নায় মা ও বোনের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার ভার গিয়ে পড়ে অবুঝ এই ছেলেটির ওপর।

​তবুও পড়াশোনা ছাড়েনি শান্ত। বাড়ির পাশের হাতিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে সে শুরু করে এক অসম সাহসিকতার সংগ্রাম। দ্বীপের এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে ছোট ছোট শিশুদের প্রাইভেট পড়াতে শুরু করে সে। কচিকাঁচা শিশুদের পড়িয়ে সামান্য যে টিউশন ফি পেত, তা দিয়েই চলত মা-বোনের অন্নসংস্থান আর নিজের পড়াশোনার খরচ। একটা কষ্টের গল্পের মত শান্তর জীবনটা এগুতে থাকে!
​চলতি বছর হাতিয়া উপজেলায় সম্পূর্ণ নকলমুক্ত ও কঠোর পরিবেশে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার করুণ চিত্র সবারই জানা। হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে পাস করেছে মাত্র ১৪% – ৪০৬ জন থেকে মাত্র ৫৭ জন পরীক্ষার্থী। আর হাতিয়া কলেজে পাস করেছে মাত্র ১৬% – ২১০ জন থেকে মাত্র ৩৪ জন। দুই কলেজ থেকে একজনও A+ পায়নি। বুঝতে পারছেন লেখাপড়া এবং ছাত্রদের মেধার মান কোথায় নেমেছে? কিন্তু হাতিয়া কলেজের এতিম ছাত্র শান্ত এমন নকলমুক্ত কঠিন পরীক্ষাতেও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.০০ (৪.০৮)* লাভ করে A গ্রেডে পাস করে সবাইকে চমকে দেয়।

​শান্তর এই রেজাল্ট আট-দশটা A+ এর চেয়েও অনেক বেশি সাফল্যের এবং সাধনার। এই ফলাফল কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়। অভাব-অনটনের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তের লড়াই, পেটে ক্ষুধা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশুদের পড়ানো এবং স্বজন হারানোর গভীর ক্ষত বুকে নিয়ে অর্জিত এই ‘এ গ্রেড’ কোটিপতি পরিবারের সোনার চামচ মুখে জন্ম নেওয়া সন্তানদের ‘ডাবল এ-প্লাস’-এর চেয়েও হাজার গুণ বেশি মূল্যবান। এটি বাংলাদেশের লাখ লাখ দরিদ্র ও বঞ্চিত তরুণের জন্য এক অভূতপূর্ব অনুপ্রেরণা।

​এখন শান্তর চোখে নতুন স্বপ্ন—একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিধবা মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সে কোথায় পাবে অর্থ? কার ছায়ায় সে পাবে সাহস? তার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া সহযোগিতার একটি হাত কি এদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না?
​শান্ত আমার ছাত্র। নিয়মিত ক্লাস করত সে। কলেজের শিক্ষকগণ শান্তকে বিনে পয়সায় অতিরিক্ত সময় পড়িয়েছেন। চিরকুমার সুব্রত স্যার লেখাপড়ার খরচাদির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন। বুকভাঙ্গা কান্না আর অদম্য সংগ্রামের নাম শান্তর ‘এ গ্রেড’। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের শান্ত এগিয়ে যাবে। শান্ত সফল হবে তার উচ্চশিক্ষার এই দুঃসাহসিক অভিযাত্রায়।
​যদি আপনাদের হৃদয়ে এই লড়াকু ছেলেটির জন্য একটুখানি মায়া ও সহানুভূতি জন্মায়, যদি কেউ তার এই উচ্চশিক্ষার যাত্রায় পাশে দাঁড়াতে বা তাকে একটু উৎসাহ দিতে চান, তবে আমার মাধ্যমে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। আমি সানন্দে ভিডিও কলে আপনাদের সঙ্গে শান্তকে কথা করিয়ে দেব এবং যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেব। দ্বীপের এই সূর্যসন্তানকে একটুখানি সাহস আর ছায়া দেওয়ার অনুরোধ রইল সবার কাছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ