শিরোনাম
প্রধান সংবাদ

হাতিয়া: সম্ভাবনার সিংহদুয়ার, নিঝুম দ্বীপ যার মুকুট

মেঘনার মোহনায় বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে থাকা হাতিয়া শুধু একটি দ্বীপ উপজেলা নয়, বাংলাদেশের সমুদ্র-সম্ভাবনার প্রবেশদ্বার। ২০১২ ও ২০১৪ সালের আন্তর্জাতিক রায়ের পর বাংলাদেশ পেয়েছে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক জলসীমা। এই সমুদ্র-বিজয়কে অর্থনীতিতে রূপ দিতে হলে সবচেয়ে আগে তাকাতে হবে হাতিয়ার দিকে। ২০২২ সালের আদমশুমারিতে এই উপজেলার জনসংখ্যা ৫ লক্ষ ৩৭ হাজার ৩৬৬, যা ২০১১ সালে ছিল প্রায় ৪ লক্ষ ৫২ হাজার। অথচ এই জনপদ দীর্ঘকাল থেকেছে উন্নয়ন-আলোচনার প্রান্তে।

নিঝুম দ্বীপ: প্রকৃতির উপহার, সতর্কসংকেতও

২০০১ সালের ৮ এপ্রিল প্রায় ১৬ হাজার ৩৫২ হেক্টর জুড়ে নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয়। ২০১৯ সালে চারপাশের জলরাশি, প্রায় ৩ লক্ষ ১৮ হাজার হেক্টর, ঘোষিত হয় সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা। ম্যানগ্রোভ বন, শীতের পরিযায়ী পাখি, বিশ্বব্যাপী বিপন্ন গাঙচষা পাখির অন্যতম প্রধান আবাস এবং দীর্ঘ নির্জন সৈকত একে করেছে দেশের এক বিরল ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য। তবে এই মুকুটে ফাটল ধরেছে। ১৯৯৬ সালের গণনায় দ্বীপে চিত্রল হরিণ ছিল প্রায় ২২ হাজার। ২০১২ সালে সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ১০ হাজারে, আর একটি সা¤প্রতিক সরকারি প্রকাশনায় প্রাক্কলন করা হয়েছে দুই হাজারেরও কম। বন বিভাগের কর্মকর্তারা কারণ হিসেবে বনভ‚মিতে মানুষের বসতি বৃদ্ধি, শিকার, কুকুর-গবাদিপশুর উপদ্রব ও দুর্যোগের কথা বলেছেন। একাধিক গবেষণা বলছে, গত ৩০ বছরে জাতীয় উদ্যানের প্রায় ৪২ শতাংশ হারিয়ে গেছে। তাই নিঝুম দ্বীপের পর্যটন হতে হবে সংরক্ষণের সঙ্গী, প্রকৃতি ধ্বংসের উপলক্ষ নয়।

যোগাযোগ: ফেরি শুরু, নাব্যতা এখন চ্যালেঞ্জ

২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি নলচিরা-চেয়ারম্যান ঘাট নৌপথে ফেরি সেবা উদ্বোধন হয়, যা ট্রলার-স্পিডবোট-নির্ভর হাতিয়ার জন্য ঐতিহাসিক মোড়। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, শুধু ফেরি যথেষ্ট নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় যে পথ পাড়ি দিতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে, গত ১৪ জুলাই নাব্যসংকটে ফেরি মহানন্দা চরে আটকে পড়ায় আড়াই শতাধিক যাত্রী ও ১৬টি পণ্যবাহী যান নিয়ে সেই যাত্রা গড়ায় প্রায় ৯ ঘণ্টায়। তাই চাই: নিয়মিত ড্রেজিং এবং জোয়ার-ভাটা বিবেচনায় ঘাট ও পল্টুনের উন্নয়ন। পর্যাপ্ত ফেরির পাশাপাশি আধুনিক, নিরাপদ ও দ্রæতগতির যাত্রীবাহী জলযান। ঘাটের সংযোগ সড়ক, দ্বীপের ভেতরের স্থলপথ, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা। ব্যক্তির সুবিধায় নয়, যাত্রীর স্বার্থে কঠোরভাবে সময়সূচি মানা।

সাগর ও মোহনার সম্পদ

সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রায় ৭ লক্ষ ৬ হাজার টন থেকে চার বছরে এক লক্ষ টনের বেশি কমেছে। অর্থাৎ শুধু আহরণ বাড়িয়ে নয়, মোহনার নাব্যতা, অভয়াশ্রম ও জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করেই এই সম্পদ রক্ষা করতে হবে। হাতিয়ায় প্রয়োজন আধুনিক অবতরণ কেন্দ্র, হিমাগার, মানসম্মত শুঁটকি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য প্রশিক্ষণ ও বিকল্প জীবিকাও জরুরি, যেমনটি নিঝুম দ্বীপের সংরক্ষিত এলাকায় আইইউসিএনের প্রকল্পে স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী ও নারীদের সংরক্ষণ কমিটিতে যুক্ত করে শুরু হয়েছে।

জীবনযাত্রার মান ও আগামীর রূপরেখা

নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও কমে যাওয়া মাছের চাপে দ্বীপবাসীর জীবন অনিশ্চিত। তাই সাফল্যের মাপকাঠি হবে জেলে, কৃষক, নারী ও যুবকদের আয় এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা। স্থানীয়দের হোমস্টে, গাইড, নৌচালনা ও হস্তশিল্পভিত্তিক পর্যটন হলে আয় দ্বীপেই থাকবে। সিঙ্গাপুর আমাদের শেখাতে পারে দ্বীপ-অর্থনীতির মূলমন্ত্র: দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, সেবার মান ও ধারাবাহিকতা। সেই পথে হাতিয়া হতে পারে এমন এক জনপদ, যেখানে ফেরি সময়মতো চলে, নিঝুম দ্বীপের বন ও হরিণ ফিরে আসে, জেলে ফেরে ভরা জালে, আর তরুণেরা দ্বীপ ছাড়ে না, দ্বীপকেই গড়ে।

রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান

এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে অনৈক্য। ফেরি উদ্বোধনের দিনেই কৃতিত্ব নিয়ে স্লোগান ও সংঘর্ষের খবর আমরা দেখেছি। সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের ভোগান্তি তখনই কমবে, যখন সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করবে। তাই সংশ্লিষ্ট সকল নেতৃত্বের প্রতি বিনীত আহŸান: অতীতের তিক্ততা ভুলে হাতিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক টেবিলে বসুন। ব্যক্তিগত অহং ও দলীয় স্বার্থ সরিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে ন্যূনতম অভিন্ন এজেন্ডায় একমত হোন। কৃতিত্বের লড়াই নয়, কাজের গুণমানে প্রতিযোগিতা করুন। প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও স্থানীয় মানুষের মতামত নিশ্চিত করুন। সহিংসতা পরিহার করুন, কারণ অশান্ত দ্বীপে পর্যটক ও বিনিয়োগ কোনোটিই আসে না। হাতিয়ার হাতে সাগর, বন, মাটি ও মানুষ সবই আছে। পরিকল্পিত অবকাঠামো, টেকসই পর্যটন, মোহনার সুরক্ষা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য মিললে হাতিয়া হবে বাংলাদেশের সমুদ্র-অর্থনীতির সবচেয়ে উজ্জ্বল সূচনাবিন্দু।

*সহকারী অধ্যাপক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এ বিভাগের আরও সংবাদ