নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া)
দলীয় বিভক্তিতে চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপি
- প্রকাশিত : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ৬:২৫:১১ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসন ২৭৩ নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটের রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর শেষ মুহূর্তের প্রচারণা শেষ করেছেন। বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থীসহ কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় চুড়ান্ত দশজন প্রার্থী ভোটের মাঠে আছেন।
ভোটের মাঠে ১০ প্রার্থীর মধ্যে মোহাম্মদ ফজলুল আজিম-স্বতন্ত্র, মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান-বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), আবদুল হান্নান মাসউদ-জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), তানভীর উদ্দিন রাজিব-স্বতন্ত্র, মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন-গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি), মোহাম্মদ আবদুল মোতালেব-জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), মোহাম্মদ আবুল হোসেন-লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম শরীফ-ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এটিএম নাবী উল্যাহ-জাতীয় পাটির্, আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক-বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)।
২১ শত বর্গকিলোমিটার আয়তনের হাতিয়া আসনটিতে ১১ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১০৪টি ভোট কেন্দ্র নিয়ে নিয়ে গঠিত। তিন লক্ষ ৩৯ হাজার ১৮৪ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ১,৭৮,৩০৯ জন, নারী ভোটার ১,৬০,৮৭৫ জন। তবে এবার নতুন বা তরুণ ভোটারের সংখ্যা ২৫৮৯৪ জন।
আসনটিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবের রহমান শামীমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে এই আসন থেকে তিনবারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও স্থানীয় বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম নানা কারণে মনোনয়ন বঞ্চিত হন। এতে তার কর্মী সমর্থকরা বিক্ষোভ প্রতিবাদ সমাবেশের মাধ্যমে হাতিয়া আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন দিতে ফজলুল আজিমের পক্ষে অবস্থান নিয়েও নিরাশ হয়েছেন।
একইভাবে বিএনপির জোরালো মনোনয়নের দাবিদার ছিলেন সদ্য সাবেক উপজেলা সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী তানভীর উদ্দিন রাজিব। তিনিও দলের প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক জিয়া ৩১ দফাও ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ব্যাপক গণসংযোগ ও প্রচার প্রচারণা চালিয়ে ভোটারদের নজর কেড়েছেন।
এনসিপির প্রার্থী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সমন্বয়ক হাতিয়ার কৃতিসন্তান আবদুল হান্নান মাসউদ দ্বীপের তরুণ নেতা হিসেবে আবিভর্‚ত হয়েছেন। ৫ আগষ্ট পরবর্তী হাতিয়ার উন্নয়ন কর্মকান্ডে সকলের সাথে নিজেকে নিরলস সম্পৃক্ত রেখে ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। এছাড়া জামায়াতের প্রার্থীতা প্রত্যাহার ও ঐক্যবদ্ধ ১১ দলীয় জোটের সমর্থন পাওয়ায় হান্নান মাসউদ ভোটের মাঠে জোরালো অবস্থান সৃষ্টি করেছেন।
তবে মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীমের সাথে ঐক্যবদ্ধ ১১ দলীয় জোটের শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদের সাথে। কিন্তু বিএনপি প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীমের বিপরীতে হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাতিয়া বিএনপির সাবেক সভাপতি (সদ্য বহিষ্কৃত) প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ও ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাতিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সেক্রেটারী (সদ্য বহিষ্কৃত) প্রকৌশলী তানভীর উদ্দিন রাজিবকে ইতোমধ্যে বহিস্কারের পরও বিদ্রোহীদের সঙ্গে দলের একটি অংশ সক্রিয় থাকায় এখানে ভোটের হিসাব নিকাশে চতুর্মুখী নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সব কিছু মিলিয়ে এ আসনে এবার নতুন ও তরুণ ৩ প্রার্থীর মধ্যে ভোট যুদ্ধের সম্ভাবনা বেশী থাকবে। তবে ‘পুরাণ চাল ভাতে বাড়ে’ শেষ মুহুর্তে সাবেক হেভীওয়েট প্রার্থী ফজলুল আজিমের রাজনৈতিক ক্যারিশমা কি দেখান তা দেখার অপেক্ষায় দ্বীপবাসী।
হাতিয়ায় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে দেখা যায়, প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দৌড়ে পরাজিত করে আমিরুল ইসলাম কালাম আওয়ামীলীগ থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৭৯ সালে তিনি বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মূলত তার সময় থেকে আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হত।
শুধু তাই নয়, হাতিয়ায় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৮৬ সালে বিপুল জনপ্রিয় স্বতন্ত্র প্রার্থী নবীর উদ্দিন সাফদারকে (হরিণ মার্কা) পরাজিত করেন বিএনপি ঘরানার নেতা মোহাম্মদ আলী জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে লাঙল প্রতীকে বিজয়ী হন। চতুর্থ সংসদ নির্বাচন ১৯৮৮ সালেও মোহাম্মদ আলী পূণরায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মোহাম্মদ ওয়ালী উল্যাহ নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ৬ষ্ঠ ও ৭ম সংসদ নির্বাচনে প্রকৌশলী মোাহাম্মদ ফজলুল আজিম বিএনপির ধানেরশীষ প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে নতুন হেভীওয়েট প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হন।
২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিন হেভীওয়েট প্রার্থীর ভোটযুদ্ধ দেখতে পায় হাতিয়াবাসী। প্রতিদ্ব›িদ্বতাপূর্ণ এ নির্বাচনটি স্মরনীয় এবং অপ্রত্যাশিতভাবে প্রকৌশলী ফজলুল আজীম ও অধ্যাপক ওয়ালী উল্যাহকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র এমপি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ আলী।
ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋনখেলাপীর দায়ে মোহাম্মদ আলীর মনোনয়ন বাতিল হয় এবং ফজলুল আজিম সংস্কার পন্থী হওয়ায় বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত হন। পরে হরিণ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন মোহাম্মদ ফজলুল আজিম।
বিএনপি জামায়াতের ভোট বর্জনের ২০১৪ সালে দশম ও ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হয়ে আয়েশা ফেরদাউস হাতিয়ায় পরপর প্রথম নারী এমপি হন। ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদের ড্যামি নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে মোহাম্মদ আলী নির্বাচিত হন।
প্রধান সংবাদ | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দলীয় বিভক্তিতে চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপি
















